শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সৃষ্টি যার আইন চলবে তাঁর

জাফর আহমাদ

যে কোন যুক্তিই হোক অথবা যে কোন আইন-বিচার-বিবেক বা তাড়নায় হোক,“সৃষ্টি যার আইন চলবে তাঁর”। পৃথিবীর যে বিজ্ঞানী যে আবিষ্কারটি করেছেন, তার ভালো-মন্দ উভয়ই ঐ বিজ্ঞানীর চেয়ে অন্য কেউ ভালো জানেন বা বলতে পারেন না। সুতরাং আবিষ্কারটির পরিচালনার পরামর্শ তার কাছ থেকেই নিতে হবে। আমাদের দৃষ্টির সীমানা এবং বাইরে যেই বিশাল সৃষ্টি রয়েছে তার মধ্যে মানুষ একটি সৃষ্টি। যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর নাম আল খালিক আর তিনিই আল মালিক। সুতরাং সেই সৃষ্টিকর্তা আল মালিকের কাছ থেকেই এই মনুষ্য জগতের পরিচালনার আইন-কানুন ও নিয়ম-পদ্ধতি তাঁর কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে। কারণ মানুষ সৃষ্টির ভালো-মন্দের রহস্য তিনিই ভালো জানেন। সুতরাং মানুষের জীবনের কোথায় কোন ইনস্ট্রুমেন্ট লাগাতে হবে, তা তাঁর কাছ থেকেই নিতে হবে। অন্যথায় মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হতে থাকবে এবং হচ্ছেও তাই। পৃথিবী জুড়ে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত নিয়ম-কানুন দিয়ে মানুষকে পরিচালনা করতে গিয়ে অসংখ্য জটিলতা মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “(জেনে রাখো) সৃষ্টি তাঁরই এবং নির্দেশও তাঁরই।” (সুরা আরাফ: ৫৪) তিনি নিছক স্রষ্টাই নন, তিনি হুকুমকর্তা এবং শাসকও। তিনি সৃষ্টি করার পর নিজের সৃষ্ট বস্তুসমূহকে অন্যের কর্তৃত্বে সোপর্দ করে দেননি অথবা সমগ্র সৃষ্টিকে বা তার অংশবিশেষকে ইচ্ছামত চলার জন্যে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেননি। বরং কার্যত সমগ্র বিশ্ব জগতের পরিচালনা ব্যবস্থা আল্লাহর নিজের হাতেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে। দিন রাত্রির আবর্তন আপনা আপনিই হচ্ছে না। বরং আল্লাহর হুকুমে হচ্ছে। তিনি যখনই চাইবেন দিন ও রাতকে থামিয়ে দিবেন আর যখনই চাইবেন এ ব্যবস্থা বদলে দিবেন। সূর্য, চন্দ্র, তারকা এরা কেউ নিজস্ব কোন শক্তির অধিকারী নয়। বরং এরা সবাই সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন। এরা একান্ত অনুগত দাসের মত সেই কাজই করে যাচ্ছে যে কাজে আল্লাহ এদেরকে নিযুক্ত করেছেন। 

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তাঁকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের গোলামী করছো তারা শুধুমাত্র কতকগুলো নাম ছাড়া আর কিছুই নয়, যে নামগুলো তোমরা ও তোমাদের পিতৃ-পুরুষরা রেখেছো, আল্লাহ এগুলোর পক্ষে কোন প্রমাণ পাঠাননি। শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নেই। তাঁর হুকুম-তোমরা তাঁর ছাড়া আর কারোর গোলামী করবে না। এটি সরল সঠিক জীবন পদ্ধতি, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।” (সুরা ইউসুফ: ৪০) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় নি¤à§‡œà¦° আয়াতটি প্রণিধানযোগ্য যে, “তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের রবে পরিণত করেছে এবং এভাবে মারয়াম পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদের মা’বুদ ছাড়া আর কারোর বন্দেগী করার হুকুম দেয়া হয়নি, এমন এক মা’বুদ যিনি ছাড়া ইবাদাত লাভের যোগ্যতাসম্পন্ন আর কেউ নেই। তারা যেসব মুশরিকী কথা বলে তা থেকে তিনি পাক পবিত্র।” (সুরা তাওবা: à§©à§§)

আদী ইবনে হাতিম (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রশ পরে নবী (সা:)-এর সামনে এলাম। তিনি বললেন: হে আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল। (এই বলে) আমি তাঁকে সুরা বারা’আতের (তাওবা) নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে শুনলাম (অনুবাদ) “তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের প-িতগণকে ও সংসার বিরাগীগণকে তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে।” (সুরা তাওবা: à§©à§§) তারপর তিনি বললেন, তারা অবশ্য তাদের পূজা করতো না। তবে তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলতো তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিত। আবার কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলতো তখন নিজেদের জন্য তাকে হারাম মেনে নিত। হাদীসটি হাসান। (তিরমিযি: ৩০৯৫, কিতাবুত তাফসীরুল কুরআন আন রাসুলিল্লাহ (সা:), বাবু সুরা আত তাওবা) 

মানুষের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর হুকুম মতো পরিচালনা করতে হবে। কারণ এই আকাশ এই পৃথিবী-সৃষ্টি সমগ্রের সৃষ্টিকর্তা তিনি। সুতরাং সৃষ্টি যার হুকুমও চলবে তাঁর। যারা আল্লাহর এই নির্দেশ অমান্য করবে, তারা তাগুতের অনুসারী। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে নবী! তুমি কি তাদেরকে দেখোনি, যারা এই মর্মে দাবী করে চলেছে যে, তারা ঈমান এনেছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং সেই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়সমূহ ফায়সালা করার জন্য “তাগুত”-এর দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুতকে অস্বীকার করার হুকুম দেয়া হয়েছিল? শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সরল সোজা পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়।” (সুরা নিসা: ৬০) 

তাগুত বলতে সুষ্পষ্টভাবে এমন শাসককে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে অন্য কোন আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে এবং এমন বিচার ব্যবস্থাকে বুঝানো হয়েছে যা আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার আনুগত্য করে না এবং আল্লাহর কিতাবকে চূড়ান্ত সনদ হিসেবে স্বীকৃতিও দেয় না। কাজেই যে আদালত তাগুতের ভূমিকা পালন করছে, নিজেরে বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালার জন্য তার কাছে উপস্থিত হওয়া যে ঈমান বিরোধী কাজ এ ব্যাপারে আয়াতটির বক্তব্য একেবারে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। আর আল্লাহ ও তাঁর কিতাবের ওপর ঈমান আনার অপরিহার্য দাবি অনুযায়ী এ ধরনের আদালতকে বৈধ আদালত হিসাবে অস্বীকৃতি জানানোই প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য। কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা ও তাগুতকে অস্বীকার করা এ দু’টি বিষয় পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে সংযুক্ত এবং এদের একটি অন্যটির অনিবার্য পরিণতি। অর্থাৎ আল্লাহ ও তাগুত উভয়ের সামনে একই সাথে মাথা নত করাই হচ্ছে সুস্পষ্ট মুনাফেকী। শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে বসে থাকলে চলবে না বরং পাশাপাশি তাগুতকেও অস্বীকার করতে হবে। সুরা নিসার পরবর্তী আয়াতগুলোতে এ ধরনের মুনাফিকদের পরিচয় আরো সুস্পষ্ট করা হয়েছে। 

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর যখন তাদেরকে কলা হয়, এসো সেই জিনিসের দিকে, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং এসো রাসুলের দিকে, তখন তোমরা দেখতে পাও ঐ মুনাফিকরা তোমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। তারপর তখন তাদের কী অবস্থা হয় যখন তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ তাদের ওপর কোন বিপদ এসে পড়ে? তখন তারা কসম খেতে খেতে তোমার কাছে আসে এবং বলতে থাকে: আল্লাহর কসম, আমরা তো কেবল মঙ্গল চেয়েছিলাম এবং উভয় পক্ষের মধ্যে কোন প্রকার সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাক, এটি ছিল আমাদের বাসনা। আল্লাহ জানেন তাদের অন্তরে যা কিছু আছে তাদের পেছনে লেগো না, তাদেরকে বুঝাও এবং এমন উপদেশ দাও, যা তাদের হৃদয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যায়।” (সুরা নিসা: ৬১-৬৩)

যারা আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না, আল কুরআনের অন্যান্য আয়াতে তাদেরকে কাফির, জালিম ও ফাসিক হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা কাফির।” (সূরা মায়েদা: ৪৪) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা যালিম।” (সূরা মায়েদা: ৪৫) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা ফাসিক।” (সূরা মায়েদা: ৪৭) 

সারা পৃথিবীর মুসলিম সমাজের রীতি-নীতি, আচার-আচরণ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপকদের রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন দেখে এ আয়াতের আলোকে তাদের পরিচিতি বিশেষ স্বভাবের লোকদের সাথে দেয়া যায়। মুসলিম উম্মাহ নিজেদেরকে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আল কুরআনের আলোকে নিজেদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। দীন কায়েমকে নিজেদের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বানাতে হবে। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পাশাপাশি পরিপূর্ণভাবে অবশ্যই তাগুতকেও অস্বীকার করতে হবে। জীবনের কোন ক্ষেত্রে সামান্য কোন বিষয়েও তাগুতের সাথে আপোস করা যাবে না। অন্যথায় মুনাফিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “(তাদেরকে জানিয়ে দাও) আমি যে কোন রাসুলই পাঠিয়েছি, এ উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার আনুগত্য করা হবে।” (সুরা নিসা: ৬৪) অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল এ জন্য আসেন না যে, কেবল তাঁর রিসালাতের প্রতি ঈমান আনতে হবে তারপর ইচ্ছেমতো যে কারো আনুগত্য করা যাবে। বরং রাসুল আগমনের উদ্দেশ্য এই হয় যে, জীবন যাপনের জন্য যে আইন কানুন তিনি আনেন দুনিয়ার সমস্ত আইন কানুন বাদ দিয়ে কেবল তারই অনুসরণ করতে হবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যে বিধান দেন সমস্ত বিধান ত্যাগ করে একমাত্র তাকেই কার্যকর করতে হবে। যদি কেউ এ কাজে ব্রতী না হয় তাহলে তার নিছক রাসুলকে রাসুল মেনে নেয়া অর্থহীন হয়ে পড়ে। 

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মু’মিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফয়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্য যে কোন প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।” (সুরা নিসা: ৬৫) এই আয়াতের নির্দেশটি কেবল মাত্র রাসুলের জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয় বরং কিয়ামত পর্যন্ত এটি কার্যকর হবে। নবী (সা:) আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু এনেছেন এবং আল্লাহর হেদায়াত ও পথপ্রদর্শনের ভিত্তিতে যে পদ্ধতিতে তিনি কাজ করেছেন, তা চিরস্থায়ীভাবে মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত ফায়সালাকারী সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই সনদটি মানা ও না মানা ওপরই কোন ব্যক্তির মু’মিন হওয়া ও না হওয়া নির্ভর করে। নবী সা: হাদীসে এ কথাটিই এভাবে ব্যক্ত করেছেন: “তোমাদের কোন ব্যক্তি মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমি যে পদ্ধতির প্রবর্তন করেছি তার অধীনতা স্বীকার করে নিবে।”

সুতরাং নিজের ঈমানের সঠিকতা প্রমাণের জন্য আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর আইনের আওতায় বিধিবদ্ধ করতে হবে। কারণ সৃষ্টি যার আইনও চলবে তার। এর কোন বিকল্প পথ, মত ও চিন্তা-ভাবনা করা কোন মু’মিন করতে পারবে না। যদি এমনটি কেউ করেন, আর যাই হোক তিনি মু’মিন নন।

 

লেখক : ব্যাংকার

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ